24/06/2024
প্রেমিকা মণিপুরের রাজকন্যা বিনোদিনী। প্রেমিক শান্তিনিকেতনের শিক্ষক রামকিঙ্কর বেজ।
শ্রদ্ধেয় শিল্পী রামকিঙ্কর বেইজের এক অজানা গল্প।
কাজের ক্ষতি করে আমি বন্ধনে বাঁধা পড়বো না, বলে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন বিনোদিনীকে মণিপুরের রাজার মেয়েকে, এমনই নিষ্ঠা ছিলো তাঁর আঁকার। অনেক গল্প ভেসে বেড়াতো ভুবনডাঙার বাতাসে নদীর কিনারে তাঁদের দুজনকে নিয়ে।সদ্য যৌবনে পা রেখেছে বিনোদিনী মা বাবাকে ছেড়ে এসেছেন শান্তিনিকেতনে।
১৯৪৫ সালে বিনোদিনী শান্তিনিকেতনে আসেন। ভর্তি হন বিশ্বভারতীর কলাভবনে। ভাস্কর্য ছিল তাঁর পছন্দের বিষয়। মা সাজিয়ে গুজিয়ে মেয়েকে পাঠিয়েছিলেন গুরুগৃহে সঙ্গে দিয়েছিলেন খুব দামী বেনারসি ও মসলিন, বিনোদিনী বুঝতে পারলেন এসব অলঙ্কার শাড়ী পরলে এখানে কেউ তার সাথে মিশবেনা, তিনি বোলপুরের হাট থেকে আনিয়ে নিলেন খুব কম দামী শাড়ী ও পুঁথির মালা, মাথায় জড়াতেন বেলফুলের মালা কখনও কখনও কানে ফুলের ঝুমকো তৈরী করে পরতেন, অসামান্যা হয়ে উঠতেন এই সাধারণ সাজে, তাঁর এই সহজিয়া সাজসজ্জা টেনেছিলো মাষ্টার মশাই রামকিঙ্করকে, এড়াতে পারেননি রাজকন্যাও প্রিয় গুরুকে,এক অসম বয়সী প্রেম ভুবনডাঙার বাতাসে নিঃশব্দে মাদকতা ছড়াতে লাগলো নির্জনে।
ঝলমলে বসন্তদিন, ফাল্গুনের পড়ন্ত বেলায় লাল খোয়াইয়ের পথে পাশাপাশি হেঁটে চলেছেন দু’জন। রামকিঙ্কর বেজ ও তাঁর ছাত্রী বিনোদিনী। হাঁটতে হাঁটতে দিগন্তের আলোছায়ায় কখন যেন একটি বিন্দু হয়ে মিলিয়ে গেলেন দু’জনে,মিশে গেলেন একে অপরের সাথে সাক্ষী থাকলো নির্জন কোপাই ,সোনাঝুরি।
খোয়াইয়ের পথে-প্রান্তরে রামকিঙ্করের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতেন তিনি। দু’জনকে দেখা যায় শালবনে, কোপাই পাড়ে, সাঁওতাল পাড়ায়। রূপবতী রাজকন্যার মনের মাধুরী মিশে যায় প্রকৃতিতে। দিনগুলো যেন রঙিন পালকের মতো ভেসে বেড়ায় খোয়াইয়ের আকাশে বাতাসে।
বিনোদিনীর উদার মন ধর্ম, বর্ণ বা অন্য কোনও রকম বিভাজনের কথা মনেই রাখেনি কখনও। তাই খুব সহজেই রামকিঙ্করের সঙ্গে নিজের মন মেলাতে পারলেন তিনি। ভুলে গেলেন তাঁর সঙ্গে রামকিঙ্করের যোজন দূরত্বের সামাজিক ব্যবধানের কথা। মনে রাখেননি নিজেদের বয়সের ব্যবধানও। ভালবাসার রাখিটি সহজেই বেঁধে দিলেন শিল্পীর প্রাণে।
রামকিঙ্করের মনের খুব কাছাকাছি গিয়ে হয়তো তিনি চেয়েছিলেন দু’জনের জীবনকেও এক করে নিতে। তাঁর এই হৃদয়াভাস রামকিঙ্করের মনকেও আলোড়িত করেছিল। আজন্ম নানা অপ্রাপ্তি নিয়ে বেডে় ওঠা রামকিঙ্করের জীবন আঁকড়ে ধরেছিল এই প্রেমকে। নিজের হৃদয়ের সবটুকু উজাড় করে তিনি আশ্রয় দিয়েছিলেন বিনোদিনীকে।
কাজে-অকাজে মাঝেমধ্যেই রামকিঙ্করের কোয়ার্টারে যান বিনোদিনী। নিজের ঘরের মোড়ায় ছাত্রীকে বসিয়ে একটার পর একটা স্কেচ করেন রামকিঙ্কর। ইংরেজি, হিন্দি, বাংলা ও মণিপুরী ভাষায় তুখোড়, সঙ্গীত ও নৃত্যকলায় কুশলী রাজকন্যা সুন্দরী, লাবণ্যময়ী। হালকা-পাতলা গড়ন। স্বপ্নমাখা দু’টি মায়াবী চোখ। তাঁর মুখটি রামকিঙ্করের মনে এমন ভাবে গাঁথা হয়ে গিয়েছিল যে, যখন খুশি মন থেকেই তিনি এঁকে ফেলতে পারতেন বিনোদিনীর পোর্ট্রেট।
বিনোদিনী ছিলেন রামকিঙ্করের অন্যতম মডেল। তাঁকে নিয়ে বহু কাজ করেছেন তিনি। ১৯৪৫ সালে সিমেন্টে করেন তাঁর পোর্ট্রেট। ১৯৪৮ সালে তেল আর জলরঙে করেন বেশ কিছু প্রতিকৃতি। এ ছাড়া রয়েছে নানা সময়ে করা অজস্র স্কেচ। তাঁর এই সব ছবি ও ভাস্কর্যের ‘বিনোদিনী সংগ্রহ’ দিল্লির ‘ন্যাশনাল গ্যালারি অব মডার্ন আর্ট’-এ সংরক্ষিত রয়েছে। কিছু কাজ রয়ে গিয়েছে বিশ্বভারতীর কলাভবনেও। বিনোদিনী সংগ্রহের ‘আর্টিস্ট অ্যান্ড মডেল’ বা ‘কমরেড’ এচিং-এ শিল্পী ধরে রেখেছেন নিজেদের।
রামকিঙ্কর এবং বিনোদিনী নির্জন বনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। বলিষ্ঠ চেহারার বেঁটেখাটো রামকিঙ্করের মাথায় তালপাতার টোকা, হাতে ছবি আঁকার বোর্ড, বিনোদিনীর দিকে চেয়ে আছেন। ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত বিনোদিনী চলেছেন পাশে পাশে। আনন্দে-আগ্রহে তাঁরা নিজেদের মধ্যে ডুবে আছেন। গাছপালারা তাঁদের ঘিরে আলোছায়ার মায়া জগৎ তৈরি করেছে। নারী-পুরুষের এমন অনাবিল মধুর ছবি বড় একটা দেখা যায় না। কিন্তু এই আলোছায়ার পথে জীবনের কতটুকু পরিক্রমা করলেন তাঁরা?
শেষ হয়ে আসছে রাজকন্যার কলাভবনে পাঠের সময়। ফিরে যেতে হবে নিজের রাজ্যে। কিন্তু সেখানে কি তিনি একা ফিরবেন? কিঙ্করদাকে রাজকুমারী বলেন, ‘চলুন আমার সঙ্গে, মণিপুরে থাকবেন।’ কিন্তু তাঁর শিল্পীমন যে কোনও বাঁধনে বাঁধা পড়তে চায়নি। বলেছিলেন, “আসল কথাটি হচ্ছে আমি কোন বন্ধনে বাঁধা পড়তে রাজি নই। ওতে কাজের ক্ষতি হয়। আমি নানা তালে ঘুরতে রাজি নই। আমার লক্ষ্য একটাই— সেটা আর্টওয়ার্ক।”
মণিপুরের রাজপরিবারও রাজি নয় রাজকন্যাকে এক বাউন্ডুলে প্রতিভার হাতে তুলে দিতে। বিনোদিনীকে তাই ছেড়ে যেতে হয় তাঁর প্রিয় কৃষ্ণরূপ শিক্ষককে। যে শিল্পী প্রেমের কথা বলতে গিয়ে বলেন, “জীবনে প্রেম এসেছিল। সে কথা কাউকে বলার নয়, সে কথা কাউকে বলা যাবে না।”
শিক্ষা শেষে মণিপুরে ফিরে গেলেন বিনোদিনী। যাওয়ার সময় স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে দিয়ে যেতে চেয়েছিলে নিজের ক্যামেরাটি। কিন্তু মায়া বাড়াননি শিল্পী: ‘সে যাবার সময় তার ক্যামেরাটা দিতে চাইল। আমি নিলাম না। কি হবে নিয়ে কোথায় হারিয়ে যাবে।’ বিনোদিনী চলে যাওয়ার পরে অনেকেই দেখেছেন গুরুদেবের কিছু কিছু গান গাইতে গাইতে রামকিঙ্করের দু’চোখ জলে ভেসে যেত। লুকনোর চেষ্টা করতেন না।
তাঁর জীবনে ‘প্রেম এসেছিল। সে কথা কাউকে বলার নয়।’ বলতে গেলে হয়তো তাঁর মনে আসত কবিগুরুর ‘চিত্রাঙ্গদা’ নাটকের সেই গান, ‘মণিপুর রাজকন্যা/ কান্তহৃদয়বিজয়ে হবে ধন্যা।’ হয়তো অশ্রুসজল চোখে তিনি দেখতে পেতেন অপস্রিয়মাণ বিনোদিনী দূরদেশের সন্ধ্যার অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছেন!
আনন্দ বাজার পত্রিকার সহায়তায়.......