20/08/2026
নারীর গাড়ি চালানো: নুসূস ও ফিকহের সমন্বয়
ইসলামে নারীর গাড়ি চালানো নিয়ে আলোচনার শুরুতে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করা যায়—গাড়ি চালানো কি কোনো শরয়ি নিষিদ্ধ কাজ? নাকি এর বিধান নির্ভর করবে গাড়ি চালানোর সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য পরিস্থিতির ওপর?
কুরআন-সুন্নাহর নুসূস এবং ফিকহের মূলনীতির আলোকে বিষয়টি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নারীর গাড়ি চালানোকে স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে হারাম বলার মতো কোনো সরাসরি ও সুস্পষ্ট নস নেই।
বরং নবী সা.-এর যুগে নারীদের বিভিন্ন বাহন ব্যবহার করার সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন:
«خَيْرُ نِسَاءٍ رَكِبْنَ الإِبِلَ صَالِحُ نِسَاءِ قُرَيْشٍ، أَحْنَاهُ عَلَى وَلَدٍ فِي صِغَرِهِ وَأَرْعَاهُ عَلَى زَوْجٍ فِي ذَاتِ يَدِهِ »
"নবী সা. বলেছেন, উষ্ট্রারোহী মহিলাদের মধ্যে কুরাইশ বংশীয় মহিলারা সর্বোত্তম। তারা শিশুদের প্রতি স্নেহশীলা এবং স্বামীর মর্যাদা রক্ষার্থে উত্তম হেফাজতকারিণী।" [মুসলিম, আস-সহিহ, হাদিস নং ২৫২৭]
অন্য একটি হাদিসে আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সা. এক সফরে ছিলেন। আনজাশা নামের একজন উটচালক দ্রুত উট চালাচ্ছিলেন এবং সেই উটগুলোর ওপর নারীরা ছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সা. তাকে বললেন:
«وَيْحَكَ يَا أَنْجَشَةُ، رُوَيْدَكَ بِالْقَوَارِيرِ»
“হে আনজাশা! ধীরে চলো; এগুলো তো কাঁচের পাত্রসদৃশ (নারী)।” [বুখারি, আস-সহিহ, হাদিস নং ৬১৬১]
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো—নারীদের বাহনে আরোহণকে নিষিদ্ধ করা হয়নি; বরং বাহন পরিচালনার পদ্ধতি সম্পর্কে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো সাহাবিয়া আসমা বিনত আবু বকর (রা.)-এর ঘটনা। তিনি যুবায়ের (রা.)-এর ঘোড়ার খাবার দিতেন, তার দেখাশোনা করতেন এবং পরিচালনা করতেন। তাঁর নিজের ভাষায়:
«فَكُنْتُ أَعْلِفُ فَرَسَهُ وَأَكْفِيهِ مَئُونَتَهُ وَأَسُوسُهُ»
“আমি তার ঘোড়াকে খাবার দিতাম, তার প্রয়োজনীয় দেখাশোনা করতাম এবং ঘোড়াটি পরিচালনা করতাম।” [মুসলিম, আস-সহিহ, হাদিস নং ২১৮২]
এখানে একটি সতর্কতা জরুরি: এই বর্ণনাকে সরাসরি “আসমা (রা.) ঘোড়ায় চড়ে তা চালাতেন”—এভাবে অর্থ গ্ৰহণ করা ঠিক নয়। তবে একজন সাহাবিয়া যে ঘোড়ার পরিচালনা, পরিচর্যা ও ব্যবস্থাপনার কাজে যুক্ত ছিলেন, তা স্পষ্ট।
এ প্রসঙ্গে ইমাম মালিক (রহ.)-এর একটি বক্তব্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। নারীদের জানাজায় যাওয়া প্রসঙ্গে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি আসমা বিনত আবু বকর (রা.)-এর ঘটনা উল্লেখ করে বলেন:
«وَلَقَدْ كَانَتْ أَسْمَاءُ بِنْتُ أَبِي بَكْرٍ تَخْرُجُ تَقُودُ فَرَسَ الزُّبَيْرِ وَهِيَ حَامِلٌ مُثْقَلٌ، حَتَّى عُوتِبَتْ فِي ذَلِكَ ... مَا أَرَى بَأْسًا، إِلَّا أَنْ يَكُونَ أَمْرًا يُسْتَنْكَرُ»
“আসমা বিনতে আবু বকর (রা.) যুবায়েরের ঘোড়া পরিচালনা করে বের হতেন, তখন তিনি গর্ভবতী ও ভারাক্রান্ত ছিলেন... তাঁকে এ ব্যাপারে আপত্তি জানানো হয়েছিল। তখন ইমাম মালিক বলেন, ‘আমি এতে কোনো অসুবিধা দেখি না, তবে যদি এমন কোনো বিষয় হয় যা শরিয়তসম্মতভাবে আপত্তিকর।’” [ইবন রুশদ, আল-বায়ান ওয়াত-তাহসীল]
এখানে লক্ষণীয়, ইমাম মালিক (রহ.)-এর বক্তব্যে আসমা (রা.)-এর “تَقُودُ فَرَسَ الزُّبَيْرِ”—“যুবায়েরের ঘোড়া পরিচালনা করতেন”—এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে নারীর স্বাভাবিক চলাফেরা ও বাহন ব্যবহারের প্রসঙ্গে গ্রহণযোগ্যতার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এটিকেও সরাসরি “ঘোড়ায় আরোহণ করে চালানো” হিসেবে অর্থ না করাই সতর্কতাপূর্ণ।
এখন আধুনিক গাড়ির ক্ষেত্রে মূল ফিকহি প্রশ্নটি হলো—গাড়ি কি নিজেই কোনো নিষিদ্ধ বস্তু, অথবা নারী কর্তৃক তা পরিচালনা করা কি নিজেই নিষিদ্ধ?
ফিকহের একটি মৌলিক নীতি:
«الأصل في العادات الإباحة»
অর্থাৎ, পার্থিব অভ্যাস ও ব্যবহারিক বিষয়ের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো বৈধতা, যতক্ষণ না নিষিদ্ধতার প্রমাণ পাওয়া যায়।
অতএব “গাড়ি চালানো”কে স্বয়ং একটি হারাম কাজ হিসেবে গণ্য করতে হলে নির্দিষ্ট শরয়ি দলিল প্রয়োজন। শুধুমাত্র নারী হওয়ার কারণে গাড়ি চালানোকে হারাম বলা হলে সেই নিষেধাজ্ঞার স্বতন্ত্র দলিল উপস্থাপন করা প্রয়োজন।
অবশ্যই এর অর্থ এই নয় যে নারী গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে কোনো শরয়ি বিধিনিষেধ নেই। গাড়ি চালানোর সঙ্গে যদি পর্দাহীনতা, অনৈতিক মেলামেশা, খালওয়াত, অনিরাপদ বা নিষিদ্ধ সফর, বেপরোয়া আচরণ কিংবা অন্য কোনো স্বতন্ত্র হারাম বিষয় যুক্ত হয়, তাহলে সেই সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিধান প্রযোজ্য হবে।
অর্থাৎ, “ড্রাইভিং” এবং “ড্রাইভিংয়ের সঙ্গে যুক্ত পরিস্থিতি”—এই দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা জরুরি।
উসূলুল ফিকহের নীতি অনুযায়ী কোনো নতুন বিষয়ের হুকুম নির্ধারণ করতে হলে তার নাম বা সামাজিক প্রচলন দেখে নয়; বরং তার প্রকৃতি, উদ্দেশ্য, সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম এবং শরিয়তের নীতিমালার আলোকে বিচার করতে হয়। আজকের গাড়ি যেমন উট বা ঘোড়ার আধুনিক পরিবহনব্যবস্থা, তেমনি এর পরিচালনার বিধানও মূলত পরিবহনের বিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই “নারী গাড়ি চালাবে কি না”—এ প্রশ্নের পরিবর্তে অধিক যথাযথ প্রশ্ন হলো—“নারীর গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে কি কোনো স্বতন্ত্র শরয়ি নিষেধাজ্ঞার প্রমাণ রয়েছে?”
নুসূস, সাহাবিদের আমল এবং ফিকহের মূলনীতিগুলো একত্রে বিবেচনা করলে ইতিবাচক ও ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো:
নারীর গাড়ি চালানো নিজে হারাম নয়; বরং তা মূলত মুবাহ। তবে গাড়ি চালানোর সঙ্গে যুক্ত আচরণ, পরিবেশ, সফরের প্রকৃতি, নিরাপত্তা, পর্দা ও অন্যান্য শরয়ি বিধান যথাযথভাবে পালন করতে হবে।
সৌদি আরবে দীর্ঘদিন আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষিতে (ধর্মীয় আদেশে নয়) নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি ছিল না। কিন্তু ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭ সালে সৌদি বাদশাহ সালমানের জারি করা রাজকীয় আদেশে নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই ট্রাফিক আইন ও ড্রাইভিং লাইসেন্সের বিধান প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং তা ২৪ জুন ২০১৮ থেকে কার্যকর হয়। সেই সরকারি রাজকীয় আদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় যে, সৌদি আরবের Council of Senior Scholars-এর অধিকাংশ সদস্যের মত—নারীর গাড়ি চালানোর মূল শরয়ি হুকুম হলো ইবাহাহ (الإباحة)। তাঁদের আপত্তি করা সদস্যদের উদ্বেগকে মূলত সম্ভাব্য অনিষ্ট প্রতিরোধের (سد الذرائع) সঙ্গে সম্পর্কিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। রাজকীয় আদেশে তাই শরয়ি ও আইনগত নিরাপত্তাবিধান নিশ্চিত করার শর্তে নারীদের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অর্থাৎ, সৌদি আরবের এই নীতি পরিবর্তনকে নিছক একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার পাশাপাশি সমকালীন ফিকহি আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবেও দেখা যায়—যেখানে “নারীর গাড়ি চালানো” এবং “এর সঙ্গে সম্ভাব্য অপব্যবহার”—দুটিকে পৃথকভাবে বিবেচনা করা হয়েছে।
ইসলামী ফিকহের সৌন্দর্য এখানেই—এটি একদিকে নুসূসের প্রতি অনুগত, অন্যদিকে নতুন বাস্তবতার ক্ষেত্রেও উসূল ও মাকাসিদের আলোকে ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান প্রদান করে।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।
---
অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ তাজাম্মুল হক
ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা-১১০০